August 11, 2020, 3:52 am

করোনা ‘ভয়াবহ’ রুপ নিবে আগষ্টে

করোনা ‘ভয়াবহ’ রুপ নিবে আগষ্টে

Spread the love

করোনা  সংক্রমণের চলমান ঊর্ধ্বমুখী ধারা চলতি মাসজুড়েই অব্যাহত থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্যবিদরা। জুনের মাঝামাঝি দেওয়া ওই পূর্বাভাসে অবশ্য বলা হয়েছিল, যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চললে আগস্টে আক্রান্তের হার নিম্নমুখী হতে পারে। তবে আগামী ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে আট সদস্যের ওই কমিটির দেওয়া পূর্বাভাস পাল্টে যেতে পারে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সারাদেশে বসবে হাজার হাজার পশুর হাট।

এসব হাটে কোরবানির পশু কেনাবেচায় জনসমাগম হবে। একই সঙ্গে ঢাকাসহ বিভিন্ন নগর থেকে লাখ লাখ মানুষ গ্রামমুখী হবেন। ঈদের ছুটি শেষে আবার তারা কর্মস্থলে ফিরবেন। এ অবস্থায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। ফলে আগস্টে সংক্রমণ কমে আসার যে পূর্বাভাস জনস্বাস্থ্যবিদরা দিয়েছিলেন তা নাও মিলতে পারে।

বরং সংক্রমণ আরও আশঙ্কাজনকহারে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের মধ্যেই জুলাইয়ের শেষে অথবা আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ঈদুল আজহা উদযাপিত হতে যাচ্ছে। ফলে আগস্ট মাসটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগস্টে সংক্রমণের হার নিম্নমুখী হওয়ার যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতি বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম তিনজনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার ১০ দিনের মাথায় ১৮ মার্চ একজনের মৃত্যু হয়। সংক্রমণের হিসাবে গতকাল সোমবার ছিল ১২১তম দিন। এই সময়ে দেশে মোট আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ৬৫ হাজার ৬১৮ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন দুই হাজার ৯৬ জন। করোনা সংক্রমণের ৮৪তম দিনে গত ৩১ মে পর্যন্ত ৪৭ হাজার ১৫৩ জন আক্রান্ত হন।

ওই সময় পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ৬৫০। ১ থেকে ৩০ জুন পরবর্তী ৩০ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ৯৮ হাজার ৩৩০ জন এবং ১ হাজার ১৯৭ জন মৃত্যুবরণ করেন। অর্থাৎ মোট সংক্রমণের ৬৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং মোট মৃত্যুর ৬৪ দশমিক ৮০ শতাংশ হয়েছে এই সময়ে।

জুন মাসে প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার ২৭৮ জন করে মানুষ আক্রান্ত এবং প্রায় ৪০ জন করে মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। ১ থেকে গতকাল ৭ জুলাই পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ২০ হাজার ১৩৫ জন। একই সময়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ২৪৯ জন। অর্থাৎ সর্বশেষ জুলাইয়ের ছয় দিনে প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার ৩৩৫ দশমিক ৮৩ জন আক্রান্ত এবং ৪১ দশমিক ৫০ জন করে মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৮ লাখ ৬০ হাজার ৩০৭ জনের।

এর মধ্যে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬১৮ জনের। এ হিসাবে পরীক্ষায় শনাক্তকরণ হার ১৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। মৃত্যুবরণ করেছেন ২০৯৬ জন। মৃত্যুহার ১ দশমিক ২৬ শতাংশ। সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৭৬ হাজার ১৪৯ জন। সুস্থতার হার ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। জুনের তুলনায় জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে আক্রান্ত ও মৃত্যুহার বেশি।

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর  বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সংক্রমণের হার স্থিতিশীল রয়েছে।

একই সঙ্গে ভাইরাসের রিপ্রোডাকশান রেট অর্থাৎ একজন আক্রান্ত ব্যক্তি কতজনকে সংক্রমিত করার ক্ষমতা রাখে সেটিও গত দুই সপ্তাহে ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এটি আশাব্যঞ্জক। তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে ধারণা করছি, সব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা একসঙ্গে কার্যকর রাখলে জুলাইয়ের শেষ নাগাদ সংক্রমণ নিম্নমুখী হওয়া শুরু করতে পারে।

ঈদকে সামনে রেখে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে ডা. আলমগীর বলেন, এতে সংক্রমণ আবারও ঊর্ধ্বমুখী রূপ নিতে পারে। সুতরাং এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। কোরবানি ও হাটের চিত্র : সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ঈদুল আজহার সময় এক কোটিরও বেশি পশু কোরবানি হয়।

গত বছর এক কোটি ১০ লাখ পশু কোরবানি হয়েছে। এবার ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে ২৪টি পশুর হাট বসবে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৪টি হাট বসানো হবে। সারাদেশে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও অস্থায়ী হাট বসানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে অনুমোদনের বাইরে আরও অনেক কোরবানির হাট বসে। সব মিলিয়ে সারাদেশে পাঁচ থেকে সাত হাজারের মতো পশুর হাট বসে। অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার জানান, কোরবানির পশুর হাটের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে একটি গাইডলাইন তৈরির কাজ চলছে। ওই গাইডলাইন অনুসরণ করেই পশুর হাট বসবে। তা ছাড়া সিটি করপোরেশনের নিজস্ব টিম এবং মোবাইল কোর্ট মাঠে থাকবে। তাদের মাধ্যমেই যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, সংক্রমণ নিম্নমুখী হয়েছে, এটি এখনই বলা যাবে না। কারণ নমুনা পরীক্ষা বাড়লে বেশি রোগী শনাক্ত হয়। আর নমুনা পরক্ষা কমলে শনাক্তও কম হয়। আবার দেখা যায়, এক জায়গায় নমুনা পরীক্ষা বেশি হচ্ছে আবার অন্য জায়গায় নমুনা পরীক্ষা কম হচ্ছে। এ অবস্থায় সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে সঠিক ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়।

ডা. মোজাহেরুল হক আরও বলেন, করোনা নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় হলো যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা। এগুলো মেনে না চললে সংক্রমণ কখনোই কমবে না। এ জন্য জনসাধারণকে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। যেসব মানুষ এসব মানবেন না, তাদের মানাতে বাধ্য করতে হবে। এ ছাড়া সংক্রমণ কোনোদিনই নিয়ন্ত্রণে আসবে না। সুতরাং কোরবানির হাটে ভিড় কিংবা শহর থেকে গ্রামে আসা-যাওয়ার অবারিত সুযোগ দেওয়া হলে সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও বাড়বে। এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে শুরু থেকেই স্বাস্থ্য বিভাগের অব্যস্থাপনা ছিল এবং এখনও সেটি আছে। সুতরাং এই অবস্থায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসার প্রসঙ্গ অবান্তর।

এ পরিস্থিতিতে সামনে ঈদুল আজহা আসছে। সারাদেশে কোরবানির হাট বসবে। যারা পশু নিয়ে হাটে আসবেন তাদের মাধ্যমে যেমন রোগ আসতে পারে, একইভাবে যারা হাটে পশু কিনতে যাবেন তাদের মাধ্যমেও রোগটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি মাংস কাটাকাটি, মাংস সংগ্রহ যারা করবেন তাদের মাধ্যমেও রোগটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ অবস্থায় আগামী আগস্ট মাসে যে নিম্নমুখী সংক্রমণের কথা বলা হচ্ছে তা বাস্তবে কাজে নাও আসতে পারে। সুতরাং এটি সবার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 jonotarbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com